Breaking News
Home / ছিলট / ব্রিটিশ আমলের চুনাপাথর ব্যবসা:আসিফ আযহার

ব্রিটিশ আমলের চুনাপাথর ব্যবসা:আসিফ আযহার

১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে বাঙলার পতনের পর ইংরেজরা এই অঞ্চলকে তিনটি কাউন্সিলে ভাগ করে (ঢাকা, পাটনা ও মুর্শিদাবাদ)। সিলেট ছিল ঢাকা কাউন্সিলের অধীনস্ত এলাকা। এই এলাকার রাজস্ব আদায়ের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ থেকে যে কর্মকর্তাকে নিযুক্ত করা হতো তাঁর পদবী ছিল ‘রেসিডেন্ট ও কালেক্টর’।
রবার্ট লিন্ডসে ছিলেন সিলেটের প্রথমদিকের একজন গুরুত্বপূর্ণ রেসিডেন্ট ও কালেক্টর। ১৭৭৮ সাল থেকে ১৭৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সফলভাবে সিলেটের রেসিডেন্ট ও কালেক্টরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের সফলতা তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করতো: মাত্রাতিরিক্ত রাজস্ব আদায়, ব্যাপক প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠন এবং বিভিন্ন ব্যবসা থেকে প্রচুর মুনাফা আদায় করা।
রবার্ট লিন্ডসে এই তিনটি ক্ষেত্রেই বেশ সফলতা দেখিয়েছিলেন। কোম্পানির হাতে বার্ষিক আড়াই লক্ষ টাকা রাজস্ব তোলে দেওয়ার পাশাপাশি সিলেটের প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠন এবং বিভিন্ন ব্যবসা থেকে প্রচুর মুনাফা লাভ করেছিলেন তিনি। লিন্ডসে লিখেছেন, সিলেটের যেসব পণ্য রফতানি করে মুনাফা পাওয়া যেতো সেগুলো হল- মোটা মসলিন, হাতির দাঁত, মধু, রাবার এবং কিছু ড্রাগ।
তবে সিলেটের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রফতানি পণ্য ছিল চুনাপাথর যা লিন্ডসের আগে কেউ ব্যপকভাবে উত্তোলন করে রফতানি করতে পারেনি। তৎকালীন সময়ে সিলেটের প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে চুনাপাথরই ছিল সেরা। কিন্তু সমস্যা হল, চুনাপাথরের কোয়ারীগুলো ছিল ইংরেজ রাজত্বের বাইরে। জৈন্তিয়া রাজ্য এবং খাসিয়া সরদারদের স্বাধীন এলাকাসমূহই ছিল চুনাপাথরের উৎসস্থল।
লিন্ডসে খোঁজ-খবর নিয়ে জেনেছিলেন যে, সিলেটের কোয়ারীগুলোর মধ্যে একটিতে মূল্যবান সাদা চুনাপাথর বা সাদাপাথর (অ্যালাবাস্টার লাইম) মেলে। এই জায়গাটি বর্তমানে ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর নামে পরিচিত। এই কোয়ারীসংলগ্ন অ্যালাবাস্টার চুনাসমৃদ্ধ পাহাড়গুলো লীজ নেওয়ার জন্য লিন্ডসে সেখানকার খাসিয়া সরদারদের সাথে সমঝোতায় গেলেন।
খাসিয়া সরদাররা জানালেন, এ ব্যাপারে সরাসরি আলাপের জন্য সমতলের কোথাও বসা যায়। ঠিক হল, খাসিয়া পাহাড়ের নিকটস্থ সমতলের পান্ডুয়া (বর্তমানে পাড়ুয়া নামে পরিচিত) নামক স্থানে উভয়পক্ষের বৈঠক হবে। এ জায়গা থেকে খাসিয়া পাহাড়কে খুবই সুন্দররূপে দেখা যায়। লিন্ডসে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখে অভিভূত হয়েছিলেন।
পাড়ুয়ায় লিন্ডসের সাথে খাসিয়া সরদারদের দুদিনব্যাপী আলাপ হল। উভয়পক্ষই সদলবলে উপস্থিত হয়েছিলেন। আলোচনাটি সফল হল। লিন্ডসে চুনাপাথর আহরণের অনুমতি পেলেন। কোয়ারীসংলগ্ন পাহাড়গুলো তাকে বন্দোবস্ত দেওয়া হল। একইসাথে ধলাই নদীতে নৌকা চলাচলের অনুমতিও পেলেন।
আলাপ-আলোচনা শেষ হওয়ার পর খাসিয়া সরদাররা লিন্ডসেকে কোয়ারী দেখার আমন্ত্রণ জানালেন। লিন্ডসে সে প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। পাড়ুয়া থেকে নদীপথে কয়েক মাইল এগিয়ে গিয়ে তারা কোয়ারী পরিদর্শন করলেন। এরপর তারা আবার ফিরে এলেন আগের জায়গায়, অর্থাৎ পাড়ুয়ার আলোচনাস্থলে।
ফেরার সময় সুচতুর লিন্ডসে খাসিয়া সরদারদের কাছ থেকে পাড়ুয়ায় একটি বাণিজ্য কুটির স্থাপনের অনুমতি আদায় করে নিলেন। লিন্ডসে বললেন, বন্য প্রাণীদের আক্রমণ থেকে নিরাপত্তার জন্য কুটিরের চারপাশে একটি দেয়াল থাকবে। খাসিয়া সরদাররা সরল মনেই তাতে সায় দিলেন। কিন্তু এই কুটির এবং দেয়াল নির্মাণের পেছনে লিন্ডসের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন!
লিন্ডসে নিজেই তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, এই দেয়ালঘেরা কুটির নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিপদের সময় যাতে এটিকে একটি দূর্গ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেয়ালটি এতো শক্ত হবে যে, কোন বিপদ হলে সিলেট শহর থেকে সাহায্য না আসা পর্যন্ত এই দূর্গের ভেতর আত্মরক্ষা করা যাবে! লিন্ডসে আসলে খাসিয়াদেরকে শতভাগ বিশ্বাস করতে পারেননি৷
অপমানিত হলে খাসিয়ারা হিংস্র হয়ে ওঠে- এটা তিনি জানতেন। যদি কোন কারণে এমন কিছু ঘটেই যায় তাহলে লিন্ডসের লোকজন যাতে সাময়িকভাবে দূর্গের ভেতর আশ্রয় নিতে পারে মূলত সে উদ্দেশ্যেই তিনি প্রাচীরবেষ্টিত বাণিজ্য কুটির বা দূর্গটি নিমাণ করেছিলেন। কুটির নির্মাণের অল্পদিন পরেই তিনি সেখানে একজন অফিসার ও বারোজন লোক নিযুক্ত করলেন।
দীর্ঘদিন এই কুটিরটি লিন্ডসের চুনাপাথর ব্যবসার কাজে লেগেছিল। তাঁর চুনাপাথরের ব্যবসা এতোটাই প্রসার লাভ করেছিল যে, পাঁচ থেকে ছয়শো জন লোক বিরামহীনভাবে পাথর উত্তোলন ও পরিবহনের কাজে যুক্ত থাকতো। পাথরের নৌকার বহরে ধলাই নদী ছেয়ে গিয়েছিল। কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে এই পাথর পাঠানো হতো।
এই ব্যবসা থেকে লিন্ডসে প্রচুর টাকা বানিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে বেশ কিছু ঝামেলাও পোহাতে হয়েছিল। খাসিয়াদের সাথে তাঁর লোকজনের ছোটখাটো ঝামেলা প্রায়ই হতো। এসব ঘটনা যাতে খাসিয়াদের গোত্রীয় পর্যায়ে না গড়ায় সেজন্য তাকে সবসময়ই সজাগ থাকতে হতো। নিজের লোকজনের জন্য প্রায়ই খাসিয়াদের কাছে ক্ষমা চাইতে হতো তাকে।
কিন্তু একবার একটি ঘটনা খাসিয়াদেরকে গোত্রীয় পর্যায়ে আলোড়িত করে তোলল। লিন্ডসের ঔপনিবেশিক মন-মানসিকতাই এর জন্য দায়ী। পাড়ুয়ার কুটিরের আশেপাশে খাসিয়াদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রেখেছিলেন তিনি। জায়গাটি ইংরেজ রাজত্বের বাইরে হলেও ঔপনিবেশিক মন-মানসিকতায় অভ্যস্ত লিন্ডসে এমন নিয়ম চালু করতে মোটেও দ্বিধা করেননি।
একবার দূর পাহাড়ের এক খাসিয়া সরদার এসে কুটির এলাকায় অবস্থান করতে লাগলেন। কুটিরের লোকজন তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলল। কিন্তু সরদার সেই নির্দেশ শুনলেন না। কুটিরের অফিসার তখন তাকে লাঠিপেটা করে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করল। অপমানিত ও লাঞ্ছিত সরদার তখন শোকবসনে নিজেকে ঢেকে পাড়ুয়ার বাজারে গিয়ে উপস্থিত হলেন।
লাঠিপেটার ঘটনার কথা জানাজানি হলে খাসিয়াদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। তারা সমতল ছেড়ে পাহাড়ে চলে গেল। এদিকে লিন্ডসেও উন্নত অস্ত্রশস্ত্রসহ কুটিরে সৈন্যসংখ্যা বাড়ালেন। কিছুদিন পরে খাসিয়ারা পাহাড় থেকে নেমে এলো। লাঞ্ছিত সরদার আর সেই অফিসারের মধ্যে প্রচণ্ড লড়াই হল। লড়াই করে দুজনেই নিহত হলো।
এরপর এই লড়াই কোন দিকে মোড় নিয়েছিল সে বিবরণ লিন্ডসে তাঁর ডায়েরিতে দেননি। শুধু লিখেছেন, ভাগ্যক্রমে কিছুদিন পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। তবে লিন্ডসে সে এলাকায় আর যাননি। পাড়ুয়ায় না গিয়ে তিনি সিলেট শহরে বসেই পাথরের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। খাসিয়ারা লিন্ডসের কুটির বা দূর্গটি ধ্বংস করেনি।
কুটিরের যে অফিসার খাসিয়া সরদারকে অপমান করেছিল সেই অফিসারের প্রতিই তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। আফিসার মারা যাওয়ার পরে ব্যাপারটা সেখানেই নিষ্পত্তি লাভ করেছিল। খাসিয়ারা লিন্ডসের ব্যবসা বন্ধ করে দেয়নি। লিন্ডসে যতোদিন সিলেটে ছিলেন, এই ব্যবসা চালিয়ে গেছেন।
লিন্ডসে চুনাপাথরের ব্যবসা শুরু করেছিলেন ১৭৭৮ সালে। পাড়ুয়ার কুটির বা দূর্গটিও নির্মাণ করেছিলেন ঐ একই বছরেই। সিলেট থেকে তিনি বিদায় নেন ১৭৮৯ সালে। চলে যান নিজের দেশে। সিলেটের পাথরের ব্যবসা এবং অন্যান্য উৎস থেকে তিনি যে বিপুল আয় করেছিলেন তা দিয়ে স্কটল্যান্ডে জমিদারি কিনে ফেলেন।
১৭৮৯ সালে লিন্ডসে পূর্ব স্কটল্যান্ডের ব্যালকারেস এস্টেট কিনে নেন। বাকি জীবন তিনি নিজের জমিদারির উন্নতির পেছনেই ব্যয় করেছিলেন। ব্যালকারেস হাউসে বসেই লিন্ডসে তাঁর সিলেট তথা ভারত জীবনের স্মৃতিগুলো লিখেছিলেন। লেখার শেষে তিনি বলেছেন, তিনি এবং তাঁর পরিবার খুবই সুখী। পার্থিব আরাম আয়েশের কোন অভাব তাদের নেই।
সিলেটের সম্পদেই লিন্ডসে জমিদার হয়েছিলেন, সুখী হয়েছিলেন। লিন্ডসের সিলেট লুণ্ঠনের সাক্ষী হয়ে আজও ব্যালকারেস হাউসটি দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী ব্যালকারেস এস্টেটের মূল্য হবে কয়েক হাজার কোটি টাকা! এর মানে হল, লিন্ডসে তাঁর শাসনামলের ১২ বছরে সিলেট থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন।
তাঁর বিদায়ের পরেও ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারীটি সচল ছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে আরও বিভিন্ন জায়গা থেকে চুনাপাথর উত্তোলন শুরু হয়। একসময় ছাতকবাজার হয়ে ওঠে এই ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র। ১৭৯৪ সালে রেইট ও জর্জ ইংলিশ নামে দুজন ব্রিটিশ ব্যবসায়ী সিলেটের চুনাপাথর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। এই ব্যবসা থেকে তারাও বিপুল মুনাফা আদায় করেছিলেন।
ছাতকবাজারকে চুনাপাথর ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন এরাই। ১৮৩৫ সালে জর্জ ইংলিশের পুত্র ক্যাপ্টেন হ্যারি ইংলিশ জৈন্তিয়া দখল করেন। তখন থেকে জৈন্তিয়ার ভেতরের কোয়ারীগুলো থেকেও পাথর উত্তোলন শুরু হয়। ১৯৪৭ পর্যন্ত সিলেটের পাথর কোয়ারীগুলো ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। এই দীর্ঘসময়ের মধ্যে তারা এই ব্যবসা থেকে কয়েক লক্ষ কোটি টাকার মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছে।
১৯৪৭ সালে এদেশ থেকে ব্রিটিশ শাসন চিরতরে বিলুপ্তি লাভ করে। তখন থেকে ব্রিটিশ নির্মিত বিভিন্ন পরিত্যক্ত স্থাপনা সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে থাকে। লিন্ডসের দূর্গটিরও একই দশা হয়েছে। হারিয়ে যেতে যেতে দূর্গটির একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র টিকে আছে। অন্যদিকে ছাতকবাজারের একটি টিলার উপর জর্জ ইংলিশের সমাধিটিও টিকে আছে। (১৮৫০ সালে তিনি ছাতকেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন।)
ঐতিহাসিক মূল্য বিবেচনায় লিন্ডসের দূর্গ এবং জর্জ ইংলিশের সমাধিটির বেশ গুরুত্ব রয়েছে। এগুলো ঔপনিবেশিক শোষণ-লুণ্ঠনের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়াও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে এগুলো ভ্রমণকারীদের কাছে দর্শনীয় হয়ে উঠতে পারে। তাই লিন্ডসের দূর্গের অবশিষ্টাংশ এবং জর্জ ইংলিশের সমাধিটিকে সংস্কার করে দর্শনার্থীদের সামনে তোলে ধরা জরুরী।
চিত্র: ব্যালকারেস হাউজ, পাড়ুয়া গ্রামের দূর্গের একাংশ, ছাতকের ইংলিশ টিলা ও ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর।
বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য

About sayeed

Check Also

জকিগঞ্জ বাজারে অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস বিক্রির চেষ্টা, আটক ১, কারাদণ্ড ও জরিমানা

জকিগঞ্জ প্রতিনিধি: সিলেটের জকিগঞ্জ বাজারে একটি অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রস্তুতির অভিযোগে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *